ইতিহাসের উপাদান হিসেবে জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থের গুরুত্ব লেখো

ইতিহাসের উপাদান হিসেবে জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থের গুরুত্ব

ইতিহাসের উপাদান হিসেবে জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থের গুরুত্ব

সরলাদেবী চৌধুরানী, একজন কবি, সাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ, এবং দেশ প্রেমিকা ছিলেন। তার আত্মজীবনী গ্রন্থ "জীবনের ঝরাপাতা" ইতিহাসের উপাদান হিসেবে আজও অম্লান। 'জীবনের ঝরাপাতা'-য় সরলাদেবী চৌধুরানী ১৮৭২ খ্রি. থেকে ১৯০৫খ্রি. সময়কালের আখ্যানে এক বালিকা থেকে তাঁর বড়ো হয়ে ওঠার জীবনকাহিনী তুলে ধরেছেন। তার আত্মকথায় তাঁর জীবনের বিভিন্ন তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে যা ইতিহাসের উপাদান হিসেবে গুরুত্তপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থের প্রকাশকাল

'জীবনের ঝরাপাতা' প্রথমে সাপ্তাহিক "দেশ" পত্রিকায় ১৯৪৪ – ৪৫ খ্রিঃ ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত হয়। পরে ১৯৭৫ খ্রিঃ আন্তর্জাতিক নারীবর্ষে এটি গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়।

জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থের বিষয়বস্তু

'জীবনের ঝরাপাতা'- গ্রন্থের বিষয়বস্তু গুলি হল -
বৃহৎ জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের কথা: তার জন্মবৃত্তান্তের ইতিকথা, ঠাকুরবাড়ির মুক্ত ও কঠোর অনুশাসনের আবহে তাঁর বেড়ে ওঠা ও শিক্ষা লাভের গল্প।

কর্মজীবন ও বাইরের জগতে প্রবেশ: তাঁর সংযোগ, "ভারতী" পত্রিকার সম্পাদক রূপে তাঁর কর্মকান্ড এবং সমকালীন প্রখ্যাত ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে তাঁর আলাপের পরিচয়।

জাতীয় চেতনা ও রাজনৈতিক কর্মকান্ড: ভারতের জাতীয় চেতনা ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে তাঁর সংযোগ।

সরলাদেবী একজন অকপট লেখিকা ছিলেন, যার আত্মকথা তাঁর জীবনের বিভিন্ন দিকে আলোকিত করেছে।

জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থের ঐতিহাসিক গুরুত্ব

ইতিহাসের উপাদান হিসাবে সরলাদেবীর "জীবনের ঝরাপাতা" ছিল এক অমূল্য ঐতিহাসিক উপাদান। এর প্রধান ঐতিহাসিক গুরুত্বের দিকগুলি আমরা নিম্নলিখিত ভাবে তুলে ধরতে পারি -

নারী ইতিহাস রচনার উপাদান:
এই গ্রন্থটিতে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার নারীদের জীবনযাত্রা, শিক্ষা, বিবাহ, পারিবারিক রীতিনীতি, সামাজিক রীতিনীতি, পোশাক, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মীয় বিশ্বাস, বিনোদন ইত্যাদি বিষয়ে অভূতপূর্ব তথ্য পাওয়া যায়। এই গ্রন্থের মাধ্যমে সরলাদেবী নিজে নারী জাগরণের জ্বলন্ত প্রতিমূর্তি ছিলেন। তার আত্মজীবনীতে নারী পুরুষের সক্ষমতা ও অধিকারের ব্যবধান সম্পর্কে নারী মননের বিশ্লেষণ সচেতনতার সঙ্গে প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি বিভিন্ন সভা-সমিতির মধ্য দিয়ে অন্তঃপুরে আবদ্ধ ভারতীয় নারীদের সংঘবদ্ধ ও সচেতন করে তোলার চেষ্টা করেছিলেন। উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে বিশ শতকের প্রথম দিক পর্যন্ত ভারতের নারী ইতিহাস রচনায় এই গ্রন্থটির মূল্য অপরিসীম।

ঠাকুরবাড়ীর অন্দরমহলের কথা:
সরলাদেবীর আত্মজীবনী "জীবনের ঝরাপাতা" থেকে ঠাকুরবাড়ীর অন্দরমহলের কথা থেকে জানা যায়। এই গ্রন্থটিতে ঠাকুরবাড়ীর নিজস্ব কিছু "প্রথা ও ঐতিহ্য" সম্পর্কে জানতে পারা যায়। নিম্নলিখিত তথ্যগুলি ঠাকুরবাড়ীর ঐতিহাসিক পরিচয় ও সংস্কৃতির অংশ হিসেবে প্রযোজ্য:

1. ঘরজমাই প্রথা: ঠাকুরবাড়ীর মেয়েদের বিবাহের পর, ঘরজমাই রাখার প্রথা অনুসরণ করা হয়।
2. ব্রাহ্ম দীক্ষা: জামাইদের বিবাহের আগে ব্রাহ্ম মতে দীক্ষিত হওয়ার নিয়ম অনুসরণ করা হয়।
3. সন্তান প্রতিপালন: ঠাকুরবাড়ীর সন্তানদের ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর, দুধমা ও ধাইমা দিয়ে সন্তান প্রতিপালন করা হয়।
4. রন্ধনশালা ব্যবস্থা: সুবৃহৎ পরিবারে বিরাট সরকারি ও বেসরকারি রন্ধনশালা প্রযোজ্য।
5. শিক্ষার ব্যবস্থা: নারী শিক্ষার ব্যবস্থা ঠাকুরবাড়ীর সামাজিক উন্নতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
6. উৎসব ও রীতি: ঠাকুরবাড়ীর অন্দরমহলে রাখিবন্ধন, বসন্ত উৎসব, মাঘোৎসব পালনের রীতি অনুসরণ করা হয়।
7. আধুনিক শাড়ি পরার রীতি: মেয়েদের যাতায়াতে পালকির ব্যবহার এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিপ্লবী আন্দোলনের সম্পর্কে তথ্য
সরলাদেবীর আত্মজীবনী থেকে বাংলার বিপ্লবী আন্দোলনের নানা অজানা তথ্যের কথা এবং বিপ্লবী আন্দোলনের সঙ্গে সরলাদেবীর জড়িয়ে থাকার কথা জানতে পারা যায়। এই আত্মজীবনী থেকে যে তথ্যগুলি জানা সম্ভব হয়েছে:

1. বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলন বিকাশের ক্ষেত্রে সরলাদেবীই প্রথম সক্রিয় ভূমিকা নেন: বাঙালি যুবকদের "মৃত্যুচর্চার আহ্বান" জানিয়ে স্বদেশ প্রেমে দীক্ষিত করেন।

2. পথে ঘাটে ইংরেজদের অনাচারের বিরুদ্ধে তিনি যুবকদের পাল্টা প্রহারের পরামর্শ দেন: "ভারতী" পত্রিকায় "বিলিতি ঘুষি বনাম দেশী কিল" প্রবন্ধে তিনি যুবকদের পাল্টা প্রহারের পরামর্শ দেন।

3. যুবশক্তির জাগরনের ব্যায়মচর্চা: তিনি "প্রতাপাদিত্য উৎসব", "উদয়াদিত্য উৎসব", "বীরাষ্টমীব্রত", এবং "লক্ষীর ভান্ডার" গড়ে তোলেন। যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে কলকাতায় গুপ্ত সমিতি গঠনে নানা ভাবে সাহায্য করেন।

বাংলায় বিপ্লবী আন্দোলন এবং বিপ্লবী আন্দোলনে নারীদের অবদানের ইতিহাস রচনায় সরলাদেবীর জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থটির মূল্য অপরিসীম।

ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব এবং অর্থনৈতিক শোষণ:
সরলাদেবী চৌধুরানীর 'জীবনের ঝরাপাতা' গ্রন্থ থেকে ঊনবিংশ শতাব্দীর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব এবং অর্থনৈতিক শোষণ সম্পর্কে জানা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের প্রভাব বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলেছিল। জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থে ঔপনিবেশিক শাসনের বিভিন্ন দিক এবং এর প্রভাব সম্পর্কে লেখিকার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে। এই গ্রন্থে তৎকালীন সময়ে ব্রিটিশরা কিভাবে নীলচাষী, শ্রমিক, খেটে খাওয়া মানুষ, কুলি মজুর এর ওপর কিভাবে শোষণ অত্যাচার চালাত তা ফুটে উঠেছে।

উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের পরিচয়
জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থে ঊনবিংশ শতাব্দীর অনেক বিখ্যাত ঐতিহাসিক ব্যক্তির জীবনের কথা জীবনের ঝরাপাতা গ্রন্থটিতে উঠে এসেছিলো। এই মহান ব্যক্তিদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন:

1. রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর: বিশ্বকবি, সাহিত্যিক, গীতিকার, বাঙালি সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠাতা।
2. স্বামী বিবেকানন্দ: যোগী, ধর্মপ্রচারক, ভারতীয় সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠাতা।
3. ভগিনী নিবেদিতা: স্বাধীনতা সংগ্রামিনী, সমাজসেবিক, নারী সমাজের উন্নতির প্রতিষ্ঠাতা।
4. বাল গঙ্গাধর তিলক: স্বাধীনতা সংগ্রামী, রাষ্ট্রবাদী, ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা।
5. মহাত্মা গান্ধী: অসহমতি সংগ্রামী, অহিংসা আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা, ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা।
6. বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়: সাহিত্যিক, কবি, বাঙালি সংস্কৃতির প্রতিষ্ঠাতা।
7. লালা লাজপত রায়: স্বাধীনতা সংগ্রামী, রাষ্ট্রবাদী, ভারতীয় স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতা।

সীমাবদ্ধতা

ইতিহাসের উপাদান হিসাবে জীবনের ঝরাপাতার বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার দিকের কথা উল্লেখ করা যায় সরলাদেবীর এই আত্মজীবনীটিতে তার সমগ্র জীবনের পরিচয় পাওয়া যায় না। বিবাহের আগে পর্যন্ত অর্থাৎ ১৮৭২ থেকে ১৯০৫ পর্যন্ত সময়কালের ইতিহাসটুকুই পাওয়া যায়। এই আত্মজীবনীটিতে ভারতের জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও নারী জাগরনে সরলাদেবীর সমগ্র কর্মকান্ড ও দৃষ্টিভঙ্গির সম্পূর্ণ প্রতিফলন ঘটেনি।

আরো পড়ুন:

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

মরু অঞ্চলে বায়ুর কাজের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায় কেন ?

ঝুলন্ত উপত্যকায় জলপ্রপাত দেখা যায় কেন?

আধুনিক ইতিহাসের উপাদান হিসেবে আত্মজীবনী ও স্মৃতিকথার গুরুত্ব কোথায়